World Myth

চাঁদ ও সূর্যের জন্ম হলো কীভাবে ? মায়া পুরাণ

হিরো টুইন্সের জন্ম

প্রাচীন কিশে মায়া সভ্যতায় দুই যমজ বালক ছিল, একজনের নাম হুন, আরেকজন হলো ভুকুব। মায়াদের ভাষায় ‘জিবালবা’ হলো পাতালপুরীর অপর নাম, যার অর্থ হচ্ছে ‘আতঙ্কের স্থান’। তো এই দুই যমজ এই জিবালবাতে যাওয়ার রাস্তাতেই নিজেদের মতো বল দিয়ে ‘পোহাতোক’ খেলতো।

হুন আর ভুকুব, দুজনেরই সারা রাজ্যে সবচেয়ে কর্মঠ আর শক্তিশালী হিসেবে খ্যাতি ছিল। ‘পোহাতোক’ খেলাতেও তাদের জুড়ি মেলা ভার। মায়াদের মধ্যে এ খেলায় তারাই ছিল সেরা। তাদের কাছে ছিল নিজেদের তৈরি অত্যন্ত শক্ত হেলমেট আর লেগ-গার্ড, তাই তাদের গায়ে আঘাত লাগতো না বললেই চলে। তাছাড়া তাদের শটগুলোও ছিল অনন্য, যে কারণে তাদেরকে হারানো ছিল এক প্রকার অসম্ভব।

যা-ই হোক, এই দুই বালকের পোহাতোক খেলার ফলে প্রচুর শব্দ হতো। আর নিয়মিত এভাবে বলের থপথপ শব্দে বিরক্ত হয়ে গেলেন মৃত্যুর দেবতারা। জিবালবায় থাকা এই দেবতাদের নাম হলো ‘একমাত্র মৃত্যু’, ‘হাড়ের রাজদণ্ড’, ‘রক্ত সংগ্রাহক’, আর ‘পুঁজের মালিক’। বিরক্ত দেবতারা সিদ্ধান্ত নিলেন এই দুই বালকের একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এদেরকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায়? অনেক ভেবেচিন্তে তারা পেঁচাদেরকে পাঠালেন দূত হিসেবে। যমজ ভ্রাতৃদ্বয়কে জিবালবায় টেনে নিয়ে আসার জন্য পোহাতোক খেলার আমন্ত্রণ জানালেন। হুন আর ভুকুব দুজনই উৎফুল্ল হয়ে উঠলো এই আমন্ত্রণে। মা নিষেধ করলেও তা অগ্রাহ্য করেই তারা যাত্রা করলো জিবালবার উদ্দেশ্যে। পেঁচারা তাদের দুজনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো।

পেঁচারা দুই যমজকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললো; Image Source: The Aztec & The Mayan Myths

এদিকে পাতালে যাওয়ার রাস্তা মোটেই সহজ নয়। প্রথমেই তারা মুখোমুখি হলো বিশাল খাড়া এক পাহাড়ের। পিচ্ছিল আর এবড়োথেবড়ো এই পাহাড় কোনোমতে পাহাড় অতিক্রম করলো দুজনে। কিন্তু সেখান থেকে নামতেই তারা দেখতে পেলো, তাদের সামনে অপেক্ষা করে রয়েছে তিনটি ভয়ানক বিপদজনক নদী। ধারালো কাঁটায় ভর্তি নদী পার হওয়ার পর রক্ত আর পুঁজভর্তি নদীও তারা পার হয়ে এলো।

যাত্রাপথে এরপর তাদের সামনে এলো আরেকটি রাস্তা। রাস্তা কিছুদূর যেতে না যেতেই তারা দেখতে পেলো, রাস্তা চারভাগ হয়ে চারদিকে মোড় নিয়েছে। প্রথম রাস্তাটির নাম ‘কালো রাস্তা’, হুন আর ভুকুবু এই রাস্তাতেই প্রথম এগোলো। রাস্তা যেদিকে মোড় নিয়েছে সে অনুযায়ী অনেকদূর হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে তারা দেখতে পেলো জিবালবার সিংহাসন। তারা কাছে গিয়ে দেখতে পেলো সিংহাসনের উপর বসে রয়েছে কিছু মূর্তি। তারা মনে করেছিলো এরাই হচ্ছে মৃত্যুর দেবতারা। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করার পর হুন আর ভুকুবু কাছে গিয়ে দেখতে পেলো এগুলো হচ্ছে আসলে কাঠের তৈরি কিছু পুতুল! হুন আর ভুকুবুকে জব্দ করতে পেরে দেবতারা হাসতে শুরু করলো। ক্লান্ত যমজ দুই ভাইকে এবার তারা বসার নির্দেশ দিলো। বসতে না বসতেই হুন আর ভুকুবু টের পেলো তারা আবার জব্দ হয়েছে। যেখানে তারা বসেছে তা হলো রান্না করার জন্য ব্যবহৃত গরম পাথর! প্রচণ্ড গরমে প্রায় পোড়া পশ্চাৎদেশ নিয়ে তারা দুজনে নাচানাচি-দাপাদাপি করতে থাকলো। তাদের অবস্থা দেখে দেবতারা এত জোরে হাসা শুরু করলো, যে এরকম হাসি তারা তাদের সারাজীবনেও হাসেনি।

হুন আর ভুকুবু শান্ত হলে দেবতারা এবার তাদেরকে পাশে রাখা একটা লণ্ঠন আর একটা সিগার তুলে নিতে বললো। দুজনের কাজ হচ্ছে সারারাত ধরে সিগার আর লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাখা। কিন্তু যে পরিমাণ জ্বালানি অবশিষ্ট ছিল তাতে রাত শেষ হওয়ার অনেক আগেই লণ্ঠন আর সিগার নিভে গেল। কাজে ব্যর্থ হওয়ায়, হুন আর ভুকুবুকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিলো মৃত্যুর দেবতারা। পরদিন সকাল হতেই মৃত্যুর দেবতারা যমজ দুই ভাইয়ের মাথা কেটে জিবালবার পোহাতোক খেলার কোর্টের নিচে পুঁতে রাখলো। একটু পর নিজেদের বিজয়ের নিদর্শনস্বরূপ হুনের মাথা একটি মরা গাছে ঝুলিয়ে দিলো।

কিন্তু গাছে হুনের মাথা ঝোলাতেই এক অদ্ভুত কাণ্ড হলো। মরা গাছে লাউয়ের মতো ফল ধরা শুরু করলো! এমনকি হুনের মাথাও অনেকটা লাউয়ের আকৃতি ধারণ করলো। এদিকে এই জাদুকরী গাছের কথা শুনে ‘শিকিক’ নামের পাতালপুরীর এক কুমারী পূজারি গাছটিকে দেখতে আসলো। শিকিক গাছ থেকে লাউ ছিঁড়তেই হুনের মাথা তার উপর নিজের থুতু ছিটিয়ে দিলো, শিকিক যদিও তা দেখতে পায়নি। অতঃপর লাউ খেতেই হুনের থুতুর কারণে শিকিক অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লো!

হুনের মাথা লাউ আকৃতি ধারণ করলো; Image Source: The Aztec & The Mayan Myths

শিকিকের বাবা কিছুদিন পর খেয়াল করলেন তার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। মেয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করলেও বাচ্চার বাবা সম্পর্কে শিকিক কিছু জানাতে পারলো না। এদিকে মেয়ের লজ্জাজনক কাজের জন্য শিকিকের বাবা তাকে মেরে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তিনি পেঁচাদেরকে আদেশ দিলেন শিকিককে বলি দেওয়ার জন্য! মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে শিকিকের বাবাকে শিকিকের হৃৎপিণ্ড দেখাতে হবে পেঁচাদেরকে।

এদিকে শিকিকও নাছোড়বান্দা। সে ভাবলো পেঁচাদের কাছে সত্যি বললে আদৌ কোনো ক্ষতি এই। তা-ই সে বললো লাউয়ের উপর থুতু খাওয়ার ফলে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। শিকিকের নিরীহ চেহারা দেখে পেঁচারাও তার কথা বিশ্বাস করলো, এবং তাকে ছেড়ে দিলো। এদিকে শিকিককে বাঁচালেও পেঁচারা এখন নিজেদের কীভাবে বাঁচাবে তাই নিয়ে চিন্তা শুরু করে দিলো। কারণ আদেশ অমান্য করার ফলে শিকিকের বাবা তাদেরকে শাস্তি দিতে কার্পণ্যবোধ করবে না।

শেষমেশ পেঁচারা অনেক ভেবেচিন্তে হৃৎপিণ্ডাকারের গাছের ছাল নিয়ে গেল শিকিকের বাবার কাছে। এদিকে জিবালবার অন্যান্য বাসিন্দারা শিকিকের হৃৎপিণ্ড ভেবে একে পুড়িয়ে ফেলতে চাইল, এবং তারা যখনই হৃৎপিণ্ড পোড়াতে শুরু করলো, তখনই গাছের ছাল পোড়ার অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো পাতালপুরীতে। এদিকে এই অদ্ভুত আর অপরিচিত গন্ধে ছোটাছুটি করতে থাকলো জিবালবাবাসীরা, আর এই সুযোগে পাতালপুরী থেকে পৃথিবীতে যাওয়ার ছোট গোপন রাস্তা দিয়ে শিকিককে বের করে নিয়ে আসলো পেঁচারা।

শিকিক পৃথিবীতে পৌঁছেই প্রথম যে কাজ করলো তা অচ্ছে শুমুকেন অর্থাৎ যমজ দুই ভাইয়ের মায়ের সাথে দেখা করা। শিকিক হুনের মাকে বললো যে সে পেটে তার নাতিকে বহন করছে। যা-ই হোক, কিছুদিন পর শিকিক বুঝতে পারলো যে তার পেটে একজন নয়, বরং দুজন ছেলে রয়েছে। শিকিকের পেট থেকে যমজ দুই ছেলে বের হলো। শিকিক তার দুই ছেলের নাম রাখলেন হুনাহপু আর জিবালাংক, মায়া সভ্যতায় যারা পরিচিত ‘দ্য হিরো টুইন’ অর্থাৎ যমজ নায়ক হিসেবে।

হুনাহপু আর জিবালাংক যত বড় হতে থাকলো, ততই তাদের মধ্যে মালি হওয়ার স্বপ্ন বড় হতে থাকলো। কিন্তু একটি সমস্যা দেখা গেলো, তারা মালি হিসেবে মোটেই ভালো নয়। যতবারই তারা আগাছা আর ঘাস কেটে আলাদা করে ফেলে, বন্য জন্তুরা বাগানে আসার সময় আরো বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে আসে। অবশেষে তারা এই জন্তুগুলো ধরার চেষ্টা করতে থাকলো। অবশেষে তারা একটা ইঁদুরকে পাকড়াও করলো। এদিকে ইঁদুর মিনতি করলো, তার জীবনের বিনিময়ে তাদেরকে একটি গোপন জিনিস বলে দেবে। হুনাহপু আর জিবালাংকও রাজি হলো।

ইঁদুর তাদেরকে পরামর্শ দিলো মালির কাজ ছেড়ে পোহাতোক খেলতে। ইঁদুর যমজ দুই ভাইকে তাদের আসল পরিচয় বললো, বললো তাদের বাবা আর চাচার দুঃসাহসিক গল্প। ইঁদুরের গল্প শুনে হুনাহপু আর জিবালাংকও মালির কাজ ছেড়ে দিলো, আর পোহাতোক খেলা শুরু করলো। বাবা আর চাচার রক্ত পোহাতোক খেলার দক্ষতা যেন তাদের রক্তে মিশে গেলো। তারা খুঁজে পেলো তাদের সহজাত দক্ষতা। আর কিছুদিনের মধ্যেই তারা মায়াদের মধ্যে সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠলো।

চাঁদ এবং সূর্যের জন্ম

তাদের বাবা এবং চার মতোই হুনাহপু আর জিবালাংকও পোহাতোক খেলার সময় প্রচুর শব্দ করতো। আর পূর্বের মতোই এই শব্দও একদিন পৌঁছে গেল জিবালবার মৃত্যুর দেবতাদের কাছে। বিরক্ত দেবতারা আবার তাদের পেঁচাদূতদেরকে পাঠালেন হুনাহপু আর জিবালাংককে মৃত্যুপুরীতে ডেকে নিয়ে আসার জন্য।

জিবালবায় যাওয়ার পথের কোনো পরিবর্তন হয়নি, তাদেরকেও সেই একই পথ অতিক্রম করতে হলো, যা তাদের বাবা এবং চাচারা কয়েক বছর আগে করেছিল। পাহাড় পেরিয়ে, কাঁটা, রক্ত আর পুঁজের নদী পার হয়ে তারা পৌঁছালো সেই চার-রাস্তার মোড়ে, তবে এবার তারা তাদের পূর্বপুরুষের মতো ভুল করলো না।

দুই যমজের পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। হুনাহপু তার মাথা থেকে একটা চুল ছিঁড়ে চুলটীকে মশা বানিয়ে ফেললো। এরপর মশাকে আদেশ দেওয়া হলো সামনের পথ দিয়ে গিয়ে যত মৃত্যুর দেবতা রয়েছে সবাইকে কামড়িয়ে দেওয়ার জন্য। মশাও যমজদ্বয়ের কথামতো এগিয়ে চললো। প্রথমে মশা সেই কাঠ দিয়ে বানানো নকল দেবতাদের মূর্তিগুলোকে কামড়ালো। কাঠের মূর্তিগুলো কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না দেখায় মশা বুঝতে পারলো এগুলো নকল মূর্তি। তারপর সে খুঁজতে খুঁজতে একসময় আসল দেবতাদেরকে পেয়ে গেল এবং কামড়ানো শুরু করলো।

মশা কামড়াতেই দেবতারা চিৎকার করার পর তার পাশের জন তাকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, “কী ব্যাপার? কী হয়েছে?” যেমন: পুঁজের মালিককে মশা কামড়াতেই সে চিৎকার করে ওঠার পর রক্ত সংগ্রাহক জিজ্ঞাসা করছে, “কী হয়েছে, পুঁজের মালিক?” আবার রক্ত সংগ্রাহককে কামড়ানোর পর সে-ও চিৎকার করে ওঠার পর পাশেরজন জিজ্ঞাসা করছে, “কী হলো, রক্ত সংগ্রাহক?”

এভাবে সবার নাম ধরে এই ডাকাডাকি খেয়াল করে শুনতে থাকলো হুনাহপু আর জিবালাংক এবং কিছুক্ষণ পরেই চার মৃত্যুদেবতার প্রত্যেকের নাম জেনে ফেললো। এরপর দুই যমজ সরাসরি দেবতাদের নাম ধরে ডাকার পর বললো তোমাদের কাঠের নকল মূর্তিগুলো সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই জানি। যমজ দুই ভাইয়ের জ্ঞানের বহর দেখে দেবতারা খুবই অবাক হলো। এরপর তারা হুনাহপু আর জিবালাংককে আদেশ দিলো গরম পাথরের উপর বসার জন্য। কিন্তু তারা জানতো এর ফলে তাদের পূর্বপুরুষদের কী পরিণতি হয়েছিল, ফলে দুজনই বসতে অস্বীকার করলো। তাদের সব চালাকি আগে থেকেই জেনে ফেলায় দেবতারা আরো আশ্চর্য হয়ে গেল।

আশ্চর্য মৃত্যুদেবতারা; Image Source: The Aztec & The Mayan Myths

এবার মৃত্যু দেবতারা তাদের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলো দুই ভাইয়ের উদ্দেশ্য। প্রথমে তাদেরকে পাঠানো হলো ‘বিষণ্ণতার ঘর’-এ। সেখানে সারারাত ধরে সেই সিগার আর লন্ঠণ জ্বালানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো তাদেরকে। হুনাহপু আর জিবালাংক ম্যাকাওয়ের লাল লেজ লাগিয়ে দিলো লণ্ঠনের প্রান্তে, অন্যদিকে সিগারের মধ্যে জোনাকি পোকা রেখে দিলো। সকালবেলা দেবতারা আসতেই তারা দেখতে পেল লণ্ঠন আর সিগার তখনো জ্বলছে! যমজ ভ্রাতৃদ্বয় তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জে বেশ ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হলো।

এরপর তাদেরকে পাঠানো হলো ‘রেজরের ঘর’-এ। সেখানে ছিল অসংখ্য ধারালো ছুরি। ছুরিগুলোকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল দুই ভাইকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলার জন্য, কিন্তু হুনাহপু আর জিবালাংক ছুরিদেরকে কোনোভাবে বুঝিয়ে বলল যে, তাদের কাজ হচ্ছে শুধু পশুদেরকেই কেটে টুকরো টুকরো করা। এরপর জাগুয়ারের ঘরে গিয়ে তারা হিংস্র জাগুয়ারদেরকে হাড় খাইয়ে কোনোভাবে বেঁচে ফিরলো। এরপর বরফের ঘর আর আগুনের ঘরে গিয়ে তীব্র ঠাণ্ডা আর গরম তাপমাত্রা সহ্য করে এই চ্যালেঞ্জগুলোতেও উত্তীর্ণ হলো।

আরো একটি পরীক্ষা বাকি ছিল তাদের জন্য। আর তা হলো বাদুড়ের ঘরে রাত কাটিয়ে আসা। এই বাদুড়গুলোর বিশেষত্ব হলো তাদের নাকের জায়গায় ধারালো ছুরি রয়েছে। এই বাদুড়গুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হুনাহপু আর জিবালাংক বিশাল আকৃতির ব্লোগানের মধ্যে লুকিয়ে বসে রইলো। এদিকে ভোরের আলো আকাশে ফুটতেই হুনাহপু আর অপেক্ষা করতে পারলো না, সে সকাল হতে আর কত দেরি তা দেখতে ব্লোগানের বাইরে মাথা বের করে দিল। আর তখনই একটি বাদুড় এসে হুনাহপুর মাথা ধড় থেকে আলাদা করে ফেললো। হুনাহপুর মাথা গড়িয়ে পৌঁছিয়ে গেল মৃত্যুদেবতাদের পায়ের কাছে। মৃত্যুদেবতারা আনন্দে চিৎকার করতে থাকলো, ভাবলো তারা জিতে গিয়েছে।

এদিকে জিবালাংক উপায় না পেয়ে আশেপাশের প্রাণীগুলোকে ডাক দিলো তাদের প্রিয় খাবার তার কাছে নিয়ে আসার জন্য। কোয়াটি (র‍্যাকুন আকৃতির প্রাণী) একটি গোল স্কোয়াশ (লাউজাতীয় ফল) নিয়ে এলো জিবালাংকের জন্য। জিবালাংক সেই স্কোয়াশ কেটে হুনাহপুর মুখের মতো আদল বানিয়ে সেটা হুনাহপুর ধড়ের উপর বসিয়ে দিল। অদ্ভুতভাবে, সেই স্কোয়াশ হুনাহপুর মাথার মতো কাজ করা শুরু করলো। এরপর দুই যমজ মিলে একসাথে মৃত্যুদেবতাদের মুখোমুখি হলো, এবং মৃত্যুদেবতারা দুই যমজকে পোহাতোক খেলার আমন্ত্রণ জানালো।

মৃত্যুদেবতাদের সাথে পোহাতোক খেলা হিরো টুইন্স; Image Source: Latin American Studies

খেলা শুরু হবার আগে, হুনাহপু আর জিবালাংক একটা খরগোশকে আদেশ দিলো পাশের একটি গাছে লুকিয়ে থাকতে। এদিকে খেলা শুরু হলো হুনাহপুর আসল মাথা দিয়ে। এদিকে কোর্টের মধ্যে হুনাহপুর লাফানো মাথা জিবালাংকের কাছে আসতেই জিবালাংক ব্যাট দিয়ে বাড়ি মেরে হুনাহপুর মাথা পাঠিয়ে দিলো খরগোশ লুকিয়ে থাকা সেই গাছে। এদিকে হঠাৎ এই ধাক্কা খেয়ে খরগোশ ভয় পেয়ে গাছ থেকে নেমে কোর্টজুড়ে লাফানো শুরু করলো। মৃত্যুদেবতারা খরগোশটিকে বল ভেবে তার পেছনে দৌড়ানো শুরু করলো। এই ফাঁকে জিবালাংক হুনাহপুর আসল মাথা ধড়ে লাগিয়ে দিল, আর আরেকটি স্কোয়াশ নিয়ে কোর্টের মাঝখানে রেখে দিলো বল হিসেবে।

মৃত্যুদেবতারা খরগোশকে আর খুঁজে না পেয়ে ফিরে এলো কোর্টে। এদিকে বলকে হুনাহপুর মাথা ভেবে লাথি মারতেই স্কোয়াশটি ফেটে চৌচির হয়ে গেল, বিচিগুলো ছড়িয়ে পড়লো কোর্টজুড়ে। বল না থাকায় অবশেষে মৃত্যুদেবতারা হার মেনে নিল। হুনাহপু আর জিবালাংক দেবতাদের সব বাঁধা অতিক্রম করতে পেরেছে ভেবে লাফানো শুরু করলো। এদিকে পাহকাম আর শুলু নামের দুই নবীকে ডাক দিলো যমজ দুই ভাই, এরপর কী করা যায় তা জিজ্ঞাসা করার জন্য। দুই নবী ঘোষণা করলো, মৃত্যুদেবতাদের এতসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে উত্তীর্ণ হলেও তাদের জন্য আসলে মৃত্যুই লেখা রয়েছে । তবে তাদের এই মৃত্যু বড় একটি পরিকল্পনার অংশ।

মৃত্যুদেবতারা আরো একটি পরীক্ষা নিয়ে হাজির হলো জিবালাংক আর হুনাহপুর সামনে। তারা বিশাল বড় একটি চুলা তৈরি করে বালকদেরকে নির্দেশ করলো এর মধ্যে চারবার লাফ দিয়ে বেঁচে ফিরে আসতে হবে। যমজ ভাইয়ের সামনে একটি পথই খোলা। তারা মাথা নিচু করে সরাসরি ঝাপ দিলো সেই বিশাল চুলায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। জিবালবাবাসীরা যমজ ভাইয়ের হাড় কুড়িয়ে নিয়ে সেগুলো গুড়ো করে নদীতে ফেলে দিল।

কিন্তু মৃত্যুর পরেও হিরো টুইন্সের অলৌকিকতা শেষ হয়ে যায়নি। হাড়ের গুড়োগুলো নদীতে ধুয়ে না গিয়ে নদীর নিচে ডুবে গেল। পাঁচদিন পর সেই হাড়ের গুড়োগুলো পরিণত হলো মাগুর মাছে। ষষ্ঠদিন তারা পুনরায় তাদের মনুষ্যাকৃতি ফিরে পেল, কিন্তু এবার পোহাতোক খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং জাদু দেখানো ভবঘুরে হিসেবে।

মৃত্যুর পাঁচদিন পর মাগুর মাছে পরিণত হওয়া হিরো টুইন্স; Image Source: K3266

এদিকে জাদু দেখিয়ে দুই ভবঘুরে মায়াদের কাছে বেশ পরিচিতি লাভ করলো। ভবঘুরে জাদুকরদের খ্যাতি পৌঁছিয়ে গেল মৃত্যুদেবতাদের কাছে। তারা আমন্ত্রণ জানালো দুই জাদুকরকে তাদের জাদু দেখানোর জন্য। হিরো টুইন্সও খুশিমনে নেচেগেয়ে তাদের জাদু দেখানো শুরু করলো। প্রথমে একজন মৃত্যুদেবতা দুই জাদুকরকে আদেশ দিলো একটি কুকুরকে বলি দিয়ে আবারো সেই কুকুরের জীবন ফিরিয়ে আনতে। খুব সহজেই যমজ দুই ভাই সেই কাজ শেষ করলো। এরপর আরেক মৃত্যুদেবতা তাদেরকে আদেশ দিলো একই জিনিস মানুষের উপর করতে। জিবালাংক হুনাহপুর মাথা কেটে শরীর আলাদা করে তার হৃদপিণ্ড বের করে মৃত্যুদেবতাদেরকে দেখালো। এরপর হুনাহপুকে আদেশ দিলো ঐ অবস্থাতেই দাঁড়ানোর জন্য। হুনাহপু দাঁড়াতেই মৃত্যুদেবতাদের তাক লেগে গেল। তারা এবার তাদের নিজেদেরকে বলি দিয়ে আবার জীবন দান করার জাদু দেখানোর জন্য আমন্ত্রণ করলো।

হুনাহপু আর জিবালাংক তা-ই করলো যা তাদের করতে বলা হলো। তারা দুজন মৃত্যুদেবতাকে বলি দিলো, কুকুর আর হুনাহপুর উপর যে কৌশল কাজে লাগিয়েছিলো ঠিক সেভাবেই। কিন্তু তারা এবার দেবতাদের জীবন ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালো। দুই মৃত্যুদেবতার নিথর দেহ পড়ে রইলো মৃত অবস্থাতেই। এদিকে বাকি দুই মৃত্যুদেবতা এই দৃশ্য দেখে প্রচণ্ড রেগে গেল। তারা জিজ্ঞাসা করলো এবার কেন জাদুকরদের কৌশল কাজে লাগলো না। হুনাহপু আর জিবালাংক এবার তাদের ভবঘুরের ছদ্মবেশ খুলে ফেললো। এরপর বললো, “আমরা আমাদের বাবা হুন আর চাচা ভুকুবের হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছি। এবার আমরা তোমাদের দুজনকেও হত্যা করবো।”

জিবালবার দুই দেবতা এবার তাদের প্রাণভিক্ষা চাইলো যমজ ভাইদের কাছে। তাদের বাবা আর চাচার কবর দেখিয়ে দিলে আর কাউকে হত্যা করা হবে না, এই শর্তে হুনাহপু আর জিবালবা দুই দেবতাকে প্রাণভিক্ষা দিলো। দেবতাদের জীবন রক্ষা পেল, কিন্তু তারা সেই আগের ক্ষমতা আর ফিরে পেল না। এদিকে হিরো টুইন্স দেবতাদ্বয়ের তথ্য অনুযায়ী তাদের বাবা আর চাচার কবর খুঁজে বের করে তাদের প্রাণ ফিরিয়ে দিল।

এরপর হিরো টুইন্স তাদের শেষ যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। তারা তাদের বাবা এবং চাচার মাধ্যমে মায়াদেরকে খবর দিতে বললো যেন তাদেরকে মনে রাখা হয় এবং তাদের উদ্দেশ্য প্রার্থনা করা হয়। হিরো টুইন্স স্বর্গে পৌঁছানোর পর চাঁদ আর সূর্যের আকৃতি পেল। আর এভাবেই তারা সবসময় আকাশ আলোকিত রাখার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মায়ারা যখনই আকাশের দিকে তাকায়, সূর্য আর চাঁদকে দেখে হিরো টুইন্সের সাহস আর আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে প্রার্থনা করে।

আঁকিয়ের কল্পনায় হিরো টুইন্স; Image Source: Stonebreaker Fine Art Gallery

What's your reaction?

Excited
0
Happy
0
In Love
0
Not Sure
0
Silly
0

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 1 =