Memories

আগাথা ক্রিস্টি “দ্যা কুইন অফ ক্রাইম”

তাঁর শবযাত্রায় লাখ-কোটি ভক্ত ও অনুরাগীদের কেউই ছিলেন না

 

আগাথা ক্রিস্টি, “দ্যা কুইন অফ ক্রাইম” নামে সারা বিশ্বে পরিচিত। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের লেখিকা আগাথা ক্রিস্টি। পরিসংখ্যান বলছে, বই বিক্রির ক্ষেত্রে উইলিয়াম শেক্সপিয়রই কেবল তাঁর সমকক্ষ। আগাথার এখনও অবধি বিক্রয়কৃত বইয়ের সংখ্যাটা অবাক হওয়ারই মত। সংখ্যাটা হল চারশো কোটি! শুধু তা-ই নয়, এ পর্যন্ত প্রায় ১০৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর বই। 

আগাথা ক্রিস্টির সবচেয়ে জনপ্রিয় বই “And Then There Were None” এখনও অবধি বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ কোটি কপি। পৃথিবীর অন্য কোনো লেখিকার কোনো একটিমাত্র বই এত কপি বাজারে বিক্রির নজির সম্ভবত নেই। লেখিকা কেন! কোনো লেখকও নেই সেই তালিকায়।

এখানেই শেষ নয়, ‘দি মাউসট্র্যাপ’ শিরোনামে আগাথা ক্রিস্টির একটি নাটক লন্ডনের বিখ্যাত Ambassador’s Theatre Hall-এ প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৫২ সালে এবং বিরতিহীনভাবে এর শো আজও চলছে। আরও একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় এই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে ত্রিশ হাজার বারেরও বেশি। শেক্সপিয়র বাদে দুনিয়ায় অন্য কোনো নাট্যকারের নাটক, দর্শকেরা টিকিট কেটে এভাবে পাগল হয়ে এতবার দেখছে বলে জানা যায় না।

১৮৯০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের টর্কিতে অবস্থিত অ্যাশফিল্ড ম্যানশনে এক ধনাঢ্য পরিবারে আগাথা ক্রিস্টির জন্ম। আগাথার পুরো নাম আগাথা ম্যারি ক্ল্যারিসা মিলার। 

মা ক্যারা বোহমার ছিলেন আইরিশ বংশোদ্ভূত এবং বাবা ফ্রেডরিক বোহমার ছিলেন একজন সফল স্টক ব্রোকার ও জন্মসূত্রে আমেরিকান । বিত্তশালী বাবার সন্তান হিসেবে আগাথা ক্রিস্টি প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েছেন।

গৃহশিক্ষকের কাছে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। ইংরেজি ও অঙ্কের সাথে সাথে সমান তালে চলত সঙ্গীতশিক্ষা। আগ্রহ ছিল ক্লাসিক্যাল মিউজিকে। আগাথা পিয়ানো ও ম্যান্ডেলিন বাজাতে পারতেন। কিন্তু পারফর্মের সময় নার্ভাস হয়ে পড়তেন। আর ছিলেন বইপাগল। হাতের কাছে যা পেতেন তাই পড়ে ফেলতেন।

আগাথার বয়স যখন মাত্র ১১ তখন আগাথার বাবা হৃদরোগে মারা যান। ফলে পরিবারকে সাময়িক আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। একটু আধটু লেখালেখি করেন আগাথা। এমনই এক সময়। আগাথাকে তার বোন দিয়ে ফেলল এক অভিনব চ্যালেঞ্জ, গোয়েন্দা উপন্যাস লেখার। আগাথা হেরে যাওয়ার পাত্রী নন। সাহসের সাথে বোনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন এবং লিখে ফেললেন, “The Mysterious Affair at Styles”। আগাথার প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস।

বইটি পর পর দুই প্রকাশক নাকচ করে দেয়ার পর, তৃতীয় জনের অনুগ্রহে ১৯২০ সালে ছাপা হল। প্রথম বইটি প্রকাশ হতে আগাথাকে প্রায় ৫ বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

প্রথমবার ছাপার পর সেই বই বাজারে খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি। কিন্তু হতাশায় আগাথা দমে গেলেন না একেবারেই। লেখা থামালেন না।

লেখালেখির পাশাপাশি খোঁজ করতে লাগলেন একজন মনের মানুষের। পেয়েও গেলেন। নাম আর্চিবল্ড ক্রিস্টি। যিনি ছিলেন ‘রয়েল ফায়িং কোর’-এর এক পাইলট। আর্চিবল্ডের জন্ম ব্রিটিশ ভারতে, তাঁর বাবা তখন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অধীনে জজ । ফায়িং কোরে যোগ দেয়ার আগে আর্চিবল্ড ছিলেন ব্রিটিশ আর্মিতে।

 

বিয়ে হল আগাথা ও আর্চিবল্ডের।

বিয়ের কিছু দিন পরই প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হল। মিত্রশক্তির হয়ে জার্মানদের বিরুদ্ধে লড়তে আর্চিবল্ড গেলেন ফ্রান্সে। এ দিকে আগাথা ক্রিস্টিও অংশগ্রহণ করলেন নার্স ও ফার্মাসিস্ট হিসেবে। যুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবাযত্নের কাজ করতে লাগলেন। 

বিয়ের বারো-তেরো বছরের মাথায় আর্চিবল্ডের পরকিয়ার কথা জানাজানি হওয়ায় আগাথা বিয়ে ভেঙে দিলেন। ততদিনে জন্ম নিয়েছে তাঁদের এক কন্যা সন্তান। আগাথা স্বামীর পদবি ছাড়লেন না। কিন্তু কেন?

কারণ হিসেবে জানা যায়, ১৯১৬ সালে ‘দ্য মিস্ট্রিস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’ নামক বইটি লিখে সাহিত্যের জগতে পদার্পণ আগাথার। যেখানে তিনি স্বামীর পদবি ‘ক্রিস্টি’ ব্যবহার করেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই বইটি লেখার সময় স্বামী আর্চিবল্ড ছিলেন আগাথার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও লেখার অনুপ্রেরণা। যেকারনে দ্বিতীয় বিবাহের পরেও তিনি ‘ক্রিস্টি’ পদবি ত্যাগ করেননি।

১৯৩০ সালে মেসোপটেমিয়ার ‘ঊর’ অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য দেখতে গেলেন আগাথা। যাত্রাপথে তার সাথে পরিচয় হল ম্যাক্স ম্যালোওয়ান নামে এক তরুণ প্রত্নতত্ত্ববিদের। পরিচয়ের পর তাঁদের একে অপরকে ভালো লাগে এবং অল্প দিনেই সেই ভালো লাগা বিয়েতে পরিণতি পায়।

ঊর’ থেকে আগাথা ক্রিস্টি তার “Murder in Mesopotamia” এবং” Death on the Nile” বইগুলোর প্লট পান। একই সময় তিনি সিরিয়া সফর করেন এবং সিরিয়া অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন “Come, Tell Me How You Live “। তারপর আগাথা যান তুরস্ক। সেখানে তিনি ইস্তাম্বুলের ‘প্যারা প্যালেস’ হোটেলের রুমে বসেই লিখে ফেলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস “Murder on the Orient Express”।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আগাথা লন্ডন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করেন। এখানে কাজ করার সুবাদে তিনি বিভিন্ন ধরনের বিষ, কেমিকেলের সাথে পরিচিত হন। যে অভিজ্ঞতা তাঁকে ভালো গোয়েন্দা উপন্যাস লিখতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল।

নার্সের কাজ করার সময় এক বেলজিয়ান শরণার্থীকে আগাথা প্রায়শই দেখতেন, যে এক সময়ে বিখ্যাত পুলিশ ছিল। আগাথা তাঁকে গোয়েন্দার রূপ দেন – “এরকুল পোয়ারো”। আর আগাথা তাঁর বড় পিসিকে দেখে পেয়েছিলেন বিখ্যাত “মিস মার্পল” চরিত্রটির আইডিয়া।

 

শোনা যায়, আগাথা নিজে হাতে গল্প লিখতেই বেশি পছন্দ করতেন। আগাথার লেখা সম্বন্ধে জানা যায়, অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে তাঁর মাথায় গল্পের প্লট আসত। যেমন কখনো হয়ত সেটা হ্যাট-টুপির দোকানে কিম্বা রাস্তায় যখন তিনি একা হাঁটছেন তখন। হ্যাট-টুপি ছিল তাঁর প্রিয় শখের মধ্যে একটি। বিভিন্ন স্টাইলের হ্যাট পরা পছন্দ করতেন আগাথা।

আগাথা তাঁর গল্প লেখা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন- “আঠারো বছর বয়সেই আমি প্রথম গল্প লিখেছিলাম তাও আবার বোনের সাথে চ্যালেঞ্জ করে! আমার মা চমৎকার একজন গল্পবলিয়ে ছিলেন। গল্প লেখার ব্যাপারে তিনি দারুণ উৎসাহীও ছিলেন এবং নিজে বেশ কয়েকটি গল্পও লিখেছিলেন। আমিও মায়ের মতো প্যাশন থেকেই গল্প লিখি।”

এই রহস্যে গল্প লিখিয়ের জীবনে রহস্য থাকবে না তাও আবার হয় নাকি। ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। হঠাৎ করে আগাথা উধাও হয়ে যান। প্রায় চারটি দেশের আইন সংস্থা দ্বারা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাঁর খোঁজ পাওয়া গেল না। শেষে প্রায় ১১ দিন পর তাঁকে পাওয়া যায় ইয়র্কশায়ারের এক হোটেলে। সবাই অবাক। তাদের প্রিয় লেখিকা তাহলে গেছিলেন কোথায়!

এই ঘটনা নিয়ে নানান গল্পকাহিনী ছড়িয়ে পরে চারিদিকে। কেউ কেউ বলেন এ্যালিয়েন নিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। আবার কেউ কেউ বলেন এটা ছিল নিছক পাবলিসিটি স্টান্ট। কারণ, সে সময় আগাথা ক্রিস্টির বইয়ের বিক্রি  কিছুটা কমে গিয়েছিল। আশ্চর্যের কথা হল যে এই বিষয় নিয়ে আগাথা নিজে কোনোদিনই মুখ খোলেননি। ‘রহস্য লেখিকা’ বলে কথা! যে কারণে এই রহস্য আজও থেকে গেছে রহস্য হিসেবেই।

১৯৭১ থেকে আগাথা ক্রিস্টির শরীর ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং এই জনপ্রিয় লেখিকা ১৯৭৬ সালের ১২ জানুয়ারি ইংল্যান্ডে নিজের বাড়িতে মারা যান।

আশ্চর্যের কথা, তাঁর শবযাত্রায় লাখ-কোটি ভক্ত ও অনুরাগীদের কেউই ছিলেন না। ভাবলেও অবাক হতে হয়। হাতে গোনা জনা কুড়ি সাংবাদিকের উপস্থিতিতে এত বড়মাপের একজন লেখিকার কফিন কবরস্থ করা হয়। অনেকের মতে আগাথার অন্তিম ও ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল নাকি এটাই। আগাথা ক্রিস্টি কেন এমন অনাড়ম্বর শেষ বিদায় বেছে নিয়েছিলেন, সেটাও কিন্তু একটা রহস্য!

What's your reaction?

Excited
0
Happy
0
In Love
0
Not Sure
0
Silly
0

You may also like

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − eleven =